ইরানের পাতা ফাঁদে নেতিনিয়াহু –দ্বিতীয় পর্ব

13076878_1153703927996540_1436594833087493010_n
আসাদুজ্জামান নোহাশ
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

উভয় ফলাফলই অনুমেয় ছিল। ২০২১ এর ফিলিস্তিনি-ইসরাঈল যুদ্ধ হলেও এটি মূলত ইরান নেতিনিয়াহু যুদ্ধে পরিনত হয়েছিল। নেতিনিয়াহু যে ভুল ট্র্যাকে পা দিয়েছেন তা প্রমানিত হয়েছে ইসরাইলী সাবেক যুদ্ধ মন্ত্রী এভিগডোর লিবারম্যানের কথায়।

তিনি ১৭ মে ২০২১ তারিখে ইসরাইলি রেডিও ১২ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বলে জানিয়েছে রুশ বার্তা সংস্থা স্পুটুনিক

তিনি বলেন “নেতিনিয়াহু ইসরাইলী জনগনের সামনে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জল করতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। আর এর ফলে হামাসের বিজয়ের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে।”

পাঠক এ কিস্তিতে আমরা দেখবো নেতিনিয়াহুকে ফাঁদে ফেলে ইরানের স্বার্থসিদ্ধি কিভাবে হলো তার বাস্তব চরিত্র।

গোয়েন্দা প্রধান বহিস্কার
এমনিতেই ৩ মে বাইডেনের সাথে সাক্ষাতের পর ইরানের ব্যাপারে খুশির খবর বলতে কিছুই আনতে পারেনি ইয়োসি কোহেন। শুধু মাত্র বাইডেনের কথার সুর নরম করতে পেরেছিলেন মাত্র। এতে নেতিনিয়াহুকে সন্তুষ্টি করতে পারেননি তিনি। তারপরে আবার ফিলিস্তিনের সাথে সংঘাত।

ঐ যুদ্ধ বিরতী কার্যকর হলো ২১ মে ২০২১, আর নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে নেতিনিয়াহু গোয়েন্দা প্রধান ইয়োসি কোহেনকে ছাটাই করলেন ২৫ মে ২০২১। এ ব্যাপারটিই নেতিনিয়াহুর ব্যর্থতা ধরতে যথেষ্ঠ।

বেচারা কোহেন তার ৪১ বছর (মোসাদ) এ চাকরির জীবনে এমনটি আশা করেননি। যে কোহেনই ইরানের চক্ষুশূল। বেশ কয়েকবার কোহেনের পরামর্শে যুক্তরাষ্ট্র কাশেম সোলেমানি কে হত্যার মতো উদ্যেগ নিয়েও পিছু হঠে। কিন্তু কোহেন সফল হন ২০২০ সালে ট্রাম্পের মতো খ্যাপাটে প্রেসিডেন্ট কে বুঝিয়ে।

আবার এই কোহেনই আরব রাষ্ট্র গুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক সাভাবিক করার মূল কারিগর।

তবুও কেন কোহেনকেই বিদায় নিতে হলো? কেননা এই যুদ্ধে কোহেন হামাসের তৎপরতা মোটেও অনুধাবন করতে পারে নি। যার ফলে হামাসের সাথে যুদ্ধে ইতিহাসের চরম বাজে পরাজয় বরন করতে হলো ইসরাইলকে।

নিজেকে বাঁচাতে নেতিনিয়াহু সুযোগ হাত ছাড়া করার পাত্র নয় তাই কোহেনের চাকরি গেলো।

আরব ইসরাইলিরা এখন প্রতিপক্ষ
এত দিন এটা এতা ঘটা করে প্রচার হতো না। নেতিনিয়াহু অথবা অন্যান্য ইসরাইলি নেতাদের সাথে অপরাধ দমন, ইসরাইলি আরব বাসিন্দাদের আবাসন সহ অনান্য বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে মুনসুর আব্বসা নতুন দল রা’ম গঠন করেন।

তিনি এখন ইসরাইলের রাজনীতিতে কিং মেকার হতে চলেছেন। গত নির্বাচনে তার দল চারটি আসন ভাল করে।

আগে থেকেই ইসরাইলি আরবরা দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিকের মতো জীবন যাপন করে আসছে। এবার ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধের মাঝে তারা ফুসে উঠেছে। বিক্ষেভ করেছে নিজেদের দাবি আদায়ের। আর আগে এই বিক্ষোভ হলেও এবারের মতো এতা ফলাও করে কখনো প্রকাশ হয়নি।

মুনসুর আব্বাস ও বাদলাদ পার্টির নেতাদের কাছে এখন ইসরাইলি নেতারা ধর্না দিচ্ছেন সরকার গঠন করার জন্য সমর্থন চাইতে। আর এখানেই সুযোগ নিচ্ছেন তারা। আর এই আরব ইসরাইলিদেরকে ইরান কৌশলে বিভিন্ন মিডিয়া বিশেষ করে হামাস আর ইসলামি জিহাদকে উসকে দিয়েছে।

গোলকধাধা তৈরি করে রেখেছে ইরান
হামসের জন্ম ১৯৮৭ সালে আহম্মদ ইয়াসিনের হাত ধরে। আহন্মদ ইয়াসিন একজন উদারনৈতিক ইসলামী স্কলার (ব্রাদারহুড ভাবধারায় অনুপ্রানিত)।
তিনি অত্যান্ত কৌশলে হামাস কে এগিয়ে নিয়ে যান। প্রথমে তিনি দাতব্য কাজ শুরু করেন। তখন ইসরাইলিরা বাধা দেয়নি। কিন্তু হামাস ১৯৯০ সালের দিকে ইরানের সাথে গোপনে যোগাযোগ করে।

এখন হামাসকে বিশ্ব মিডিয়া আর জঙ্গি বলে চালিয়ে দেয়না। এটি মুলত কাতার আর ইরানের কারনে। যদি জঙ্গি বলে তাহলে ইরান ও কাতার জঙ্গি তোষনের দায়ে দন্ডিত হবে কেননা হামাস এর লালন আর তোষন এরাই করে।

নিজেদের বন্ধু রাষ্ট্রের মাধ্যমে তারা হিজবুল্লাহ আর হামাসকে জঙ্গি নাম ঘুচিয়ে রাজনৈতিক দলের প্রলেপ লাগানোর কাজ শুরু করে ২০১০ সালের পর হতে। হামাস এখন মধ্যপ্রাচ্যের দূর্বল রাষ্ট্রের বড় শক্তি যে কোন গতিপ্রকৃতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।

সুন্নি হামাসের সাথে শিয়া ইরানের মিল হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি না। কিন্তু ইরান তার উদার মনে এখানে হামাসকে সাহায্য করেছে। যতটা না হামাস আর ফিলিস্তিনের স্বার্থে, তার চেয়েও বেশি নিজের স্বার্থে।

২০২১ সালের ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধ যে ইরানের পাতা ফাঁদ ছিলো সেটার প্রমান দেখুন ২২ মে ২০২১ এ হামাস নেতা ইসমাঈল হানিয়ার বক্তব্যে। সেখানে তিনি ইরানের সামরিক আর অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।

পাল্টা খামেনি আবার ইসলামি জিহাদ এবং হামাসকে চিঠি লিখেন যাতে তারা ভবিষতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে রুখে দাড়ায়।

ধারনা করা হয় মিশরের সিনাই উপত্যকার ভেতর দিয়ে সমরাস্ত্র আর অনান্য উপকার ব্রাদারহুডই হামাসকে সরবরাহ করে। আর হামাস ব্রাদারহুড এর ভাবধারায়ই পরিচালিত।

ইরান এখন চাইবে যে (যেহেতু মিশর রাফা সিমান্ত খুলে দিয়েছে) হামাস কে আরো অস্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করতে। যদি এটা করা সম্ভব হয় তা হলে ইসরাইলের রাতের ঘুম হারাম হবে। তবে ধরে রাখেন যে ইরান এটা যে কোন মুল্যে করবে, পাঠক কারন একটু পরে বলছি।

নেতিনিয়াহু বিদায় হবেন
গত দুই বছর ধরে ইসরাইলে কোন স্থিতিশীল সরকার প্রধান নেই। তারা নিজেদের মাঝে ঐক্য তৈরি করতে পারেননি। বরং দেখা যায় যে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন (২০১৪ সাল হতে প্রেসিডেন্ট) একবার একে আরেকবার ওকে সরকার গঠনের জন্য আহব্বান করছেন।

তার পরে আবার বেচারা বন্ধু আরোন মিশাল এর নিকট হতে উৎকোচন গ্রহন করার জন্য, বিশ্বাসঘাতকতা, দূর্নিতি আর ধোকাবাজির মামলায় পড়ে আছেন যার শুরু ২০১৯ সালে ২১ নভেম্বর হতে। জনমত তার বিপক্ষে চলে যায়।

একটি বিষয় এখানে গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, ইসরাইল নামক রাষ্ট্র যেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত সেখান হতে নিউজ বের হয় কি করে? পাঠক দিন বদলিয়েছে।

তুরস্কের আনাদোলু, ইয়েনি শাফাক, রাশিয়ার স্পুটুনিক আর কাতারের আল জাজিরা একটা অলিখিত এজেন্ডা নিয়েছে যে, তারা ইসরাইলের হাড়ির খবর বের করবে। যেটা দশ বছর আগে এতটা সম্ভব হতো না।

ইতোমধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ এ বিবিসি জানায় যে, নেতিনিয়াহু বিচারের মুখোমুখি। ভাব লক্ষন দেখে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি ফেঁসে গেছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরাইল
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালেতর (আইসিসি) প্রধান কৌশুলি বেনসুদ ফাতু গত মার্চ মাসের ৪ তারিখে ঘোষনা দেন যে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপোরাধ খতিয়ে দেখবে। এতে নেতিনিয়াহু আরো বিপদে পড়ে যান।

এমনিতে নিজ দেশে তিনি বিচারের মুখোমুখি তারপরে আবার আইসিসি’র বিচার। পাঠক এখানে ইসরাইল এর বিচার বলতে রাষ্ট্র ইসরাঈলের বিচার হলেও (তৎকালিন এবং বর্তমান) সরকার প্রধান হিসেবে নেতিনিয়াহুই আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াবেন?

আর একটু খোলাসা করা যাক, তাতমোদা মানে মিয়াননমারের সেনা যখন রোহিঙ্গা নিধন করলো আর্ন্তজাতিক আদালতের কাঠগড়ায় কে উঠেছিলে? আমরা জানি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সুচি? ঠিক এভাবেই নেতিনিয়াহু বিচারে মুখোমুখি হবেন এবং ফেঁসেও যাবেন। ফেঁসে যাবেন এটা নিশ্চিত ভেবে বসে থাকবেন না। উনাকে ফাঁসাবেন ইরান আর তুরস্কের যৌথ শক্তি।

এখন প্রশ্ন হলো কাকে দিয়ে ফাঁসাবেন? সে লোকও আছে।

ইরানের পরিকল্পনা বহুদূর
পাঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো গুটি চালার খেলা মানে দাবার মতো। ইরান এখানে খেলবে চীন আর রাশিয়াকে দিয়ে। কিভাবে খেলাবেন এবার দেখেন।

চীনের সাথে ইসরাইলের ভালো সম্পর্ক আমরা জানি। তবে কবে থেকে সেটা জানি কি? সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর ১৯৯৩ সাল হতে। ইসসরাইলকে চীন তখনই স্বীকৃতি দেয়। অথচ চিয়াং কাইশেক আর মাও এর চীনকে ইসরাইল স্বীকৃতি দেয় ১৯৪৯ সালে। মাও সে ভুল করে পাল্টা ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়নি।

চীনা নেতারা এটা ভালো করে জানেন তার চেয়ে বড় কথা খামেনি এই ইতিহাস ভালো করেই জানেন আর বোঝেন কি কারনে মাও এটি করেননি।

চীনা বিনিয়োগ এখন আফ্রিকার দেশ সমূহের তথা গোটা বিশ্বের জন্য দরকার (তর্কের খাতিরে ভারত ছাড়া)। আর গোটা বিশ্ব এখন চীনের হাতের সাথে। চীনের কাছে গোটা আফ্রিকার যত মূল্য তার চেয়ে ইরান আর তুরস্কের মূল্য অনেক বেশি (বর্তমান প্রেক্ষাপটে)। কেননা মধ্যপ্রাচ্য চীনের নিয়ন্ত্রনে থাকা মানে গোটা বিশ্ব হাতের মুঠোয়। তাই ইরান আর তুরস্কের স্বার্থ রক্ষা করতে যা যা প্রয়োজন তা করতে চীন দ্বিধা করবে না।

ইরান এখন আইসিসি’কে চীনের দ্বারা প্রবাবিত করবে, আর ইসরাইলকে বিতর্কিত করে তুলতে চেষ্টা চালাবে। আর এসব নিয়েই ইসরাইলী নেতারা ব্যস্ত থাকবে। আর এদিকে আড়ালে বসে ইরান তার আনবিক চুক্তি সারবে।

যুক্তরাষ্ট্র যাতে আনবিক চুক্তিতে না ফিরে সে জন্য ইসরাইলি গোয়েন্দা প্রধান (ইরানের আনবিক কর্মসূচির সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে) কোহেন ৩ মে ২০২১ এ তদবরি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এবং তিনি খানিকটা সফলও হন। কিন্ত ব্যাটে বলে টাইমিং করাতে পারেননি।

ইরান জানেন এই কোহেন থাকলে তার বিপদ। তাই তারা কৌশলে হামাস কে দিয়ে ইসরাইলকে পরাজিত করে। যার ফলস্বরূপ কোহেন আউট ডেভিড বার্নিয়া ইন।

পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন ইরানের লাভ কি হলো? লাভ আছে। বার্নিয়া মোসাদ প্রধান হয়ে সব কিছু গুছিয়ে নিতে সময় প্রযোজন আর এখানেই ইরান তার পরিকল্পনাতে সফল হয়েছে।

এখন গোয়েন্দা প্রধান নিজে সব কিছু নিজের আয়ত্বে নিবেন না নিজ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন নাকি আইসিসি’কে সামলাবেন? খেলা এখানেই, খেলেছে ইরান। যাকে বলে মাষ্টারস্টোক।

এখন ইরান যা করবে
এর পরে ইরান তার প্রক্সি গুলোকে তৈরী রাখবে যাতে ইসরাইলকে ব্যতিব্যস্ত রাখা যায়। মাঝে মাঝে লেবানন থেকে রকেট, সিরিয়া হতে মিসাইল আর গাজা হতে আক্রমন করে ইসরাইলের মনোসংযোগ বা দৃষ্টি যেন নিজ দেশের সীমানার মধ্যে থাকে।

কেননা ইসরাইল কে ব্যতিব্যস্ত না রাখলে ইরান আনবিক চুক্তি করতে গেলে সমস্যার সম্মুখিন হবে।

তাছাড়া ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি বলয় যে মার খাচ্ছে তাতে সৌদি সন্মানজনক সমাধান চেয়ে ইরানের নিকট ধরনা দিচ্ছে বলে কথিত আছে। যদি ইসরাইলকে অস্থিতিশীল করা যায় তাহলে এর সমাধান করা সম্ভব হবে। আর এতে সৌদিদের যতটানা লাভ হবে তার চেয়ে ইরান এগিয়ে থাকবে কারন ইয়েমেনে ইরানের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হবে।

পাঠক উপরের ব্যাপার গুলো হাতে এককাপ চা নিয়ে সবুজান্বিত বারান্দায় চোখ বুজে ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, দেখেন কি ভয়ঙ্কর অবস্থা দাড়ায় আপনার ভাবনার জগতে। ইরান ইসরাইলি সীমান্তের কোন দেশ না কিন্ত তার উপস্থিতি ইসরাইলের সীমান্তে। ইরানের কাছে আনবিক বোমা থাকা যতটানা ভয়ঙ্কর ব্যাপার নিজ সীমান্তে ইরানের ইপস্থিতি তার চেয়েও ইসরাইলের কাছে বেশি অস্থিকর। কেননা ইরানই বিশ্বের একমাত্র দেশ যে ইসরাইলকে বিশ্ব মানচিত্র হতে মুছে ফেলার হুমকি দিয়েছে।

প্রথম পর্বঃ ইরানের পাতা ফাঁদে নেতিনিয়াহু

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন