চিরবিদায় নিলেন সালাম সালাম হাজার সালাম গানের গীতিকার বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজল-এ-খোদা

বেড়া পাবনা প্রতিনিধি : চিরবিদায় নিলেন সালাম সালাম হাজার সালাম গানের মেধাবী গীতিকার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার কৃতীসন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজল-এ-খোদা (১৯৪১-২০২১)।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোর ৪টার দিকে ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী – মাহমুদা সুলতানা, তিন পুত্র – ওয়াসিফ-এ-খোদা সবুজ (দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত), ওনাসিস-এ-খোদা সজীব (সাংবাদিক), ওয়েসিস-এ-খোদা অনুজ (ব্যাংকার) এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেলেন।

দৈনিক এ যুগের পরিবারের পক্ষ থেকে তাট বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই৷
বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় সেরা ২০ গানের মধ্যে ১২তম স্থানে রয়েছে ফজল-এ-খোদার লেখা ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি।ফজল-এ-খোদা ১৯৪১ সালের ৯ মার্চ পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা খোদা বক্স ও মাতা জয়নবুন্নেছা। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ ফজল-এ-খোদা বেড়া বিপিন বিহারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে প্রবেশিকা ও বাংলা কলেজ, ঢাকা থেকে ১৯৬৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তার তিন ছেলে, সবাই ঢাকাতেই থাকেন।

ফজল-এ-খোদার লেখা গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’, ‘ভালোবাসার মূল্য কতো, আমি কিছু জানি না’, ‘কলসি কাঁধে ঘাটে যায় কোন রূপসী, ‘বাসন্তী রং শাড়ি পরে কোন রমণী চলে যায়, ‘আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগ’ ‘প্রেমের এক নাম জীবন’, ‘বউ কথা কও পাখির ডাকে ঘুম ভাঙেরে, ‘খোকন মণি রাগ করে না’।তিনি বেতারে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

ছড়াকার হিসেবে লেখালেখি শুরু করেছিলেন ফজল-এ-খোদা। দেশাত্মবোধক, আধুনিক, লোক সংগীত এবং ইসলামিক গান লিখে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন।কবিতা চর্চার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হলেও পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা গানের গীতিকার হিসেবেই নিজের সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তোলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর “সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহিদ স্মরণে” গানটি সর্বস্তরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাংলা চলচিত্রেও কিছু কালজয়ী গান রচনা করে তিনি বিশেষভাবে নন্দিত ও সমাদৃত হন।

কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ বেতারে দীর্ঘদিন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ পরিচালক হিসেবে অবসরে যান। গীতিকার হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র – এপার ওপার, মনের মানুষ, দেবর ভাবি, ওরাও মানুষ, সমাপ্তি, স্বামীর সোহাগ, বিচার, বধূবরণ, অস্বীকার, দস্যু বনহুর, অশান্ত প্রেম, নওজোয়ান, অপমান, অপেক্ষা ইত্যাদি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গান – মন রেখেছি আমি তার মনেরও আঙিনায় (এপার ওপার), আমার লক্ষ্মী বোন শোন বলি শোন (অস্বীকার), প্রেমের এক নাম জীবন (মনের মানুষ), ভালোবাসার মূল্য কত (এপার ওপার) বউ কথা কও পাখির ডাকে ঘুম ভাঙরে (দেবর ভাবি), মানুষের গান আমি শুনিয়ে যাবো (মনের মানুষ), সে প্রিয়তমেষু না অন্য কিছু (এরাও মানুষ), ওরে ও মাটির মানুষ (বিচার), জানিনা কেমনে দেখা হলো দু’জনে (স্বামীর সোহাগ) ইত্যাদি।বেতার মুখপত্র “বেতার বাংলা” র তিনি ছিলেন প্রথম সম্পাদক এবং ইংরেজি মাসিক বাংলাদেশ বেতার ও শাপলা শালুক-এর সাবেক সম্পাদক। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : কবিতা- সূর্য স্বর্ণ দ্বীপ (১৯৬৮); বিতর্কিত জ্যোৎস্না (১৯৭৩); নামে যার কেঁপে ওঠে (১৯৯০)। নাটক : মোক্তারপাড়া (১৯৭০)। গীতিকাব্য : সঙ্গীতা (১৯৭৩); ইসলামি গান (১৯৮০); গান (১৯৯৭); মন্দিরা (২০০২); বন্দেগি (২০০২)। বড়দের ছড়া : সানাই (১৯৭৬)। প্রবন্ধ-গবেষণা : প্রাসঙ্গিকী (১৯৮৩)। শিশুসাহিত্য : মিতাভাইয়ের আসর (১৯৭৭); ফুলপাখিদের গান (১৯৮৬); জমজম (১৯৮৯); আড়ি (১৯৯০); টুনটুনি (১৯৯০); নাটক নাটক (২০০০); জয় মুক্তিযুদ্ধ (২০০৭); রবীন্দ্র নজরুল বঙ্গবন্ধু জয়নুল (২০০৭)। সম্পাদনা : প্রেম পিরীতি (১৯৯৬)।

সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত কর্তৃক সুমন্ত সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১০ সালে ঢাকাস্থ পাবনা সমিতি কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন।

আরও পড়ুনঃ চিরবিদায় নিলেন সালাম সালাম হাজার সালাম গানের গীতিকার বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজল-এ-খোদা

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন