১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা ও সমসময়ে আমার উপর নির্মম নির্যাতন

বাঙালী জাতীর জন্য এক কালো দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। এদিন ভোরে সপরিবারে হত্যা করা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালী, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালী জাতীর মুক্তির কান্ডারী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। ঐ দিনই সন্ধ্যাবেলায় আকস্মিক এক বেতার ভাষণে বাঙালী জাতীর কলঙ্ক বেইমান খোন্দকার মুশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে দাবী করে। এবং নির্মমভাবে বিনাবিচারে হাজার হাজার আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা আটক ও কারাগারে হত্যা করে।

বেইমান খোন্দকার মুশতাকের নির্দেশে ৩রা নভেম্বর হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমেদ, এম. মনসুর আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানকে।

এই হত্যালীলার অন্তর্নিহিত ও অঘোষিত উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকেই হত্যা করা, বাংলাদেশকে নেতৃত্বহীন করা মুক্তিযুদ্ধ ও তার পূর্ববর্তী দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে ধারাবাহিক ভাবে পরিচালিত বাঙালি জাতির গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার আইনের শাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের সুমহান সংগ্রামী আদর্শগুলিকে হত্যা করে দিয়ে তার পরিবর্তে ১৯৪৭ এর আগষ্ট পরবর্তী পাকিস্তানী ভাবাদর্শ ফিরিয়ে আনা।

সেসময় আওয়ামীলীগের শত শত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরনকারীদের জেল, জুলুম, হত্যা, নির্যাতন করা হয়। যার ব্যতিক্রম ঘটেনি আমার সাথেও।

সেই স্বাধীনতা পূ্র্ববর্তি সময় হতে আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মনে প্রানে আঁকড়ে বক্ষে ধারন করে রেখেছি। আমি স্কুল জীবনে ১৯৬১ সন হতে ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করি। ১৯৬৪ সনের ৪ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশে ও তৎকালীন কিংবদন্তি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের দিক নির্দেশনায় আমার নেতৃত্বে ঈশ্বরদীর এসএম স্কুল মাঠে আইয়ুব খানের জনসভা পন্ডুল করি। আইয়ুব খান উক্ত জনসভায় সরাসরি মাইকে ঘোষণা করেছিলেন ”মার দো শালেকো”। তবু আমরা উক্ত জনসভা ভেঙে দেই।

উক্ত জনসভা ভন্ডূল করার কারনে জাতির পিতা আমাকে অত্যান্ত স্নেহ করতেন। তিনি বহুবার তার স্নেহমাখা বাহু বন্ধনে আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন এবং আমার কপালে আদরভরা স্নেহচুম্বন করেছেন। সেই প্রেরনা ও ভালোবাসা আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি।

আমার নেতৃত্বে ১৯৬৫ সনে ঈশ্বরদী উপজেলার এমএস স্কুলে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার স্থাপিত হয়। আমার নেতৃত্বে ঈশ্বরদী উপজেলায় ১৯৬৬ সনে ৬ দফা ও ১৯৬৯ সনে গন অভ্যুত্থানের স্বপক্ষে আন্দোলন করে ঈশ্বরদী উপজেলার ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। আমি ১৯৭০ সনে ঈশ্বরদী কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হই।

১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ আমি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত থেকে সরাসরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষন অবলোকন করি। আজ পর্যন্ত কোন জনসভায় আমি এতো মানুষের সমাগম দেখিনি।

১৯৭১ সনের ২৬ শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী এদেশের মানুষের উপর ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য হত্যাকাণ্ড শুরু করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতে যায় এবং দেদুনদিয়া সেনানিবাসে আর্মিদের স্পেশাল টেনিং নেই। আর্মি ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় আমাকে বৃহত্তর ঈশ্বরদী উপজেলার মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান নির্বাচন করা হয়।

আমি ট্রেনিং সম্পূর্ণ করে দেশে ফিরে এসে আমার অন্য সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সাহসী সন্তানদের নিয়ে স্থানীয় ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করি এবং ট্রেনিং শেষে আমরা ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন রনাঙ্গনে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীও দোষরদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।

১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বাংলদেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের এদেশীয় চক্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করার পর থেকেই তদানীন্তন সামরিক স্বৈর বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করতে পাগলা কুকুরের মত হন্যে হয়ে খুজতে থাকে।

কারন ওরা জানতো যে, আমিই ছিলাম এ অঞ্চলের একজন নিবেদিত প্রান মুজিবাদর্শের অকুতভয় কর্মি ও সংগঠক।

অবশেষে পহেলা আক্টোবর ১৯৭৫ ভোর রাতে ঈশ্বরদী কলেজ রোডস্থ তদানীন্তন পৌর আওয়ামী লীগের সম্পাদক আলহাজ্ব নায়েব আলি বিশ্বাসের বাস ভবন থেকে ভোর রাতে আমাকে আর্মি ও পুলিশ গ্রেফতার করে। প্রথমে থানা ও সকালে ওরা আমাকে পাবনা জালালপুর ক্যাডেট কলেজে (যেখানে আর্মি টর্চার কেন্দ্র ছিল) নিয়ে যায়। সেখানে তারা আমাকে বলে, তোর কাছে নাকি তোফায়েল আহমেদের দশট্রাক অস্ত্র আছে ও গুলো বের কর। আমি অস্বীকার করে বলি “স্বাধীনতার পর আমার অস্ত্র আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে জমা দিয়েছি। আমার কাছে কোন অস্ত্র নেই। তখন থেকেই ওরা আমার উপর চরম অমানুষিক নির্যাতন করতে থাকে।

আমি সহ যারা তখন ওদের কাস্টডিতে ছিলাম তাদের একটা ছোট রুমে আটকে রেখে দিনের পর দিন সন্ধার পর থেকে সারারাত ওই ঘরে ৫০০ ওয়াটের ৭/৮টি বাল্ব জ্বালায়ে ঘরের জানালা গুলো খুলে আমাদের খালি গায়ে রাখা হতো। ফলে হাজার হাজার বিষাক্ত ফুতি পোকায় ঘর ভরে যেত। ঐ বিষাক্ত পোকা গায়ে বসায় সারা শরীর প্রচন্ড চুলকাতো। যার ফলে সারা শরীরে ঘা হয়ে গায়ের আসল চামড়া উঠে গিয়ে ছিল।

তারা আমার শরীরের বিভিন্ন স্হানে করেন্ট দিয়ে শক দিতো, চিৎ করে বেঁধে নাকে মুখে পানি ঢালতো, নদী চরে নিয়ে গিয়ে গলা পর্যন্ত পুতে রাখতো। এমনি নানাবিধ অমানবিক অবর্ণনীয় নির্যাতন করত যা ভাষায় বর্ণনা করা যায়না। তাদের নির্যাতনের ক্ষত আমার শরীরে এখনো বহন করে বেড়াচ্ছি।

এমন ভাবে ওরা প্রায় তিন মাস ক্রমাগত নির্যাতনের পরও আমার থেকে যখন কোন অবৈধ্য্ অস্ত্র পেল না তখন তারা আমাকে মুমুর্ষ অবস্থায় একটা ভাঙ্গা রাইফেল দিয়ে আর্মি মার্শাল কোর্টে চালান করে দিল। সামরিক কোর্ট আমাকে ৩ বছর জেল দিলো।

জেলে মেজর জিয়া আমার কাছো প্রস্তাব পাঠালো তার দল করার জন্য। আমাকে উত্তরাঞ্চলের শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্বের পাশাপাশি সংসদ সদস্য সহ বাড়ি, গাড়ি ও আরো অনেক লোভনীয় প্রস্তাব দিলো। কিন্তু আমি ঐ সকল প্রস্তাবকারীদের প্রস্তাব তাদের মুখের উপরই ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করে দৃঢ় ভাবে বলে দিতাম “আমি জাতির পিতার যে স্নেহ, যে ভালবাসা পেয়েছি তা আমার শরীরে এক ফোটা রক্ত থাকা পর্যন্ত সেই আদর্শের সাথে বেইমানি করবো না। কোন অত্যাচারে বা কোন প্রলোভনে কোন অপশক্তিই আমাকে জাতির পিতার মহান আদর্শ হতে এক তিল পরিমান বিচ্যুত করতে পারবেনা।”ফলে আমাকে জেল খেটেই বেরুতে হয়।

অবশ্য জেলে থাকা অবস্হাতেই আমাকে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত করা হয়। অবশেষে ১৯৭৮ সালের ২৭ জুন আমি মুক্তি পায়।

মুক্তি পেয়েই আমি বিদ্ধস্থ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠন পুনঃগঠনে নেমে পরি। ১৯৭৯ সালে আমি থানা আওয়ামীলীগে সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৮১/৮২ সনে আমি সম্মেলনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ তাঁত শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হই।

এরপর, শ্রদ্ধেয় আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল ভায়ের নির্দেশে আামাকে এবং বর্তমান জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মন্টু ও বর্তমান শ্রম সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ কে জাতীয় শ্রমিক লীগ পুনঃগঠনের দায়িত্ব প্রদান করেন। যা আমরা সফলতার সাথে পালন করি।

এদিকে ১৯৮৪ সন থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আমি অপ্রতিদন্দি ভাবে ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। এই দীর্ঘ সময় আমি ঈশ্বরদীতে জাতির পিতার আদর্শের সংগঠন আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সকল অংগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মকান্ডকে পুনঃগঠন ও শক্তিশালী করি।

বর্তমানে আমি পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতির দায়িত্বে আছি। আমার এই সু-দীর্ঘরাজনৈতিক জীবনে আমি তিন বার বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। ছাত্রজীবনে আমি কলেজ সংসদের এজিএস, জিএস নির্বাচিত হয়েছি। কর্মজীবনে আলহাজ্জ টেক্সটাইল মিলে সিবিএতে বার বার সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছি। সামাজিক ভাবে আমি বিভিন্ন নামি দামি স্কুল কলেজের ম্যানেজি্ং কমিটিতে সদস্য নির্বাচিত হয়েছি।

এ অঞ্চলের মানুষর ভালবাসার কারনে আমি জীবনে কোন নির্বাচনে পরাজিত বা দ্বিতীয় হইনি। সকল নির্বাচনেই আমি প্রথম হয়েছি। সততা ও নিষ্ঠার সাথে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মহান আদর্শ ও মানুষর অকৃপ্তিম ভালবাসাই আমার চলার পথের পাথেয়।

পরিশেষে আজ এই শোকের দিনে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তার পরিবারের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাদের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি।

আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বিশ্বাস
উপজেলা চেয়ারম্যান, ঈশ্বরদী,
সহ-সভাপতি, পাবনা জেলা আওয়ামীলীগ।

একই ধরনের খবর

মন্তব্য করুন